1. doinikuttoron@gmail.com : doinikuttoron.com :
বৃহস্পতিবার, ২৪ জুন ২০২১, ০৩:৪৭ অপরাহ্ন
সর্বশেষ সংবাদ
স্বামীর পছন্দের মার্কায় ভোট না দেওয়ায় পিটিয়ে জখম উপহার নিয়ে আর ভিক্ষা করে করোনা ভ্যাকসিনের চাহিদা মিটানো সম্ভব নয় – গোলাম মোহাম্মদ কাদের সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টার ফলেই প্রবল বৃষ্টিপাতেও নগরবাসী জলজটের ভোগান্তি থেকে মুক্ত রয়েছে-ডিএনসিসি মেয়র মোঃ আতিকুল ইসলাম করোনায় জীবন দিলেন পুলিশের আরও এক গর্বিত সদস্য রাজধানীর মিরপুর এলাকার কিশোর গ্যাং অপুর দল এর গ্যাং লিডার অপুসহ তিন কিশোর অপরাধী’ গ্রেপ্তার । ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশ ও জনমানুষের কল্যাণে কাজ করুন-আইজিপি বস্তিবাসীদের কল্যাণে বস্তিগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা জোরদার করতে ফায়ার হাইড্রেন্টের ব্যবস্থা করা হবে-ডিএনসিসি মেয়র মোঃ আতিকুল ইসলাম পল্লীবন্ধু এরশাদের মৃত্যু বার্ষিকীর দিনে কোন নির্বাচন চাই না – জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এর মৃত্যু দিবসে উপ-নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তনের দাবি রাণী ভবানী

রাণী ভবানী

  • Update Time : রবিবার, ৬ জুন, ২০২১

বগুড়া প্রতিনিধিঃ রেজাউল করিম

রাণী ভবানীর জন্মস্থান ছাতিয়ান গ্রাম। ছাতিয়ান গ্রামের প্রাচীন নাম ছিল মহনগঞ্জ। বগুড়া জেলার আদমদীঘি উপজেলা থেকে ৫কিলোমিটার পশ্চিমে ছাতিয়ান গ্রামে এই রাণী ভবানী জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্মস্থান জমিদার বাড়িটি এখন সুধুই কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সংস্কার ও সংরক্ষণের অভাবে দিন দিন ভেঙে পড়ে রাণী ভবানীর এই জন্মস্থানের ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। দখল হয়ে যাচ্ছে জমিদার বাড়িসহ আশেপাশের জমি। রাণী ভবানীর জীবনের তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, আদমদীঘি উপজেলার ছাতিয়ান গ্রামে ছিলেন এক জমিদার। নাম তার আত্মারাম চৌধুরী, স্ত্রীর নাম তমাদেবি চৌধুরী রাণী। একজন রাজা জমিদারের যা যা থাকার কথা সব কিছুই ছিল জমিদার আত্মারাম চৌধুরীর। কিন্তু দীর্ঘদিন রাণী তমাদেবির সন্তান না হওয়ায় জমিদার পরিবার দুঃখ-বেদনা অনুভব করতেন। এক পর্যায়ে তমাদেবির স্বামী আত্মারাম চৌধুরীর বাড়ির পার্শ্বে সিদ্ধশ্বরী মন্দিরে সন্তানের বাসনা নিয়ে প্রতিদিন সিদ্ধিতে বসতেন। দীর্ঘদিন ধ্যানে বসার এক পর্যায়ে স্ত্রী তমাদেবি চৌধুরী রাণী কন্যা সন্তান প্রসব করেন। সেই কন্যা সন্তানের নাম রাখা হয় ভবানী। সেই সময় খুশিতে জমিদার আত্মারাম চৌধুরী এলাকার বহু গরিব-দুঃখী মানুষকে জমি দান করেন। দিন দিন বড় হতে থাকে ভবানী। ভবানী ছোট বেলা থেকে পূজা-অর্চনা করতো এবং মানুষের সেবা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। নারীরা সাধারণত বিয়ের পূর্বে কৃতিত্ব অর্জন করতে পারে না, কিšুÍ এক্ষেত্রে ভবানী ছিলেন এক ব্যতিক্রম নারী। ভবানী ছোট বেলা থেকেই ছাতিয়ান গ্রামের গরিব-দুঃখী মানুষের কষ্ট নিবারণ করতেন। এবাদত বন্দেগী করার জন্য মসজিদ, মন্দিরসহ পড়ালেখার জন্য এলাকায় স্কুল নির্মাণ করার ব্যবস্থা করেন। সেই সময় মানুষের পানির অভাব মিটাতে এলাকায় ৩৬৫টি পুকুর খনন করেছিলেন এবং সেই পুকুরগুলোর সাথে তার স্মৃতি জড়িত রাখতে প্রতিদিন একটি করে পুকুরে গোসল করতেন। যেভাবে ভবানীর বিয়ে হয়ে রাণী হলেন। ভবানীর পিতা আত্মারাম চৌধুরী নাটোরের জমিদার রামাকান্তের চেয়ে ক্ষুদ্র জমিদার ছিলেন।

রামাকান্তের মতো এক বিরাট জমিদার যে কিভাবে ছোট জমিদার আত্মারাম চৌধুরীর কন্যাকে বিয়ে করলেন। সে সর্ম্পকে ছাতিয়ান গ্রাম এলাকার একাধিক ব্যক্তি জানান, সে সময় ছাতিয়ান গ্রামে ছিল অনেক বন-জঙ্গল। সেই বনে বাঘ, হরিণসহ প্রভৃতি প্রাণী ছিল। সেইসব বন-জঙ্গলে একদিন নাটোরের জমিদার রামাকান্ত ছাতিয়ান গ্রামের বন-জঙ্গলে শিকার করতে এসে এলাকায় টাম্বু টাঙ্গান। সে সময় একদিন ভোরে টাম্বু থেকে শিকারে বের হয়ে দেখতে পেলেন একটি ফুট ফুটে সুন্দরী মেয়ে ফুল গাছের নীচে দাঁড়িয়ে গাছ থেকে ফুল তুলছে। রাজা মেয়েটিকে দেখে মুগ্ধ হয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন মেয়েটি আত্মারাম চৌধুরীর একমাত্র কন্যা। নাম তার ভবানী। রাজা রামাকান্ত তখন শিকার না করে নাটোরে ফিরে যান এবং মেয়েটিকে বিয়ে করার কথা পিতা রামজীবনকে জানান। রামজীবন ছেলের কথা শুনে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে নিজেই আত্মারাম চৌধুরীর জমিদার বাড়িতে আসেন এবং বিয়ের মতামত জনতে চাইলে ভবানী কয়েকটি শর্তে বিয়েতে রাজী হন। প্রথম শর্ত ছিল বিয়ের পর তিনি পিতার বাড়িতে এক বছর অবস্থান করবেন, দ্বিতীয় শর্ত ছিল ছাতিয়ান গ্রাম জমিদার বাড়ি থেকে নাটোর জমিদার বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ করে পুরো রাস্তা লাল শালু কাপড় দিয়ে জড়িয়ে দিতে হবে, যার উপর দিয়ে তিনি স্বামীর বাড়িতে যাবেন। তৃতীয় শর্ত ছিল এলাকার গরিব-দুঃখী প্রজাদের ভূমি দান করে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। রাজা রামজীবন সকল শর্ত মেনে নিয়ে ভবানীর পিতা জমিদার আত্মারাম চৌধুরীকে নাটোর থেকে ছাতিয়ান গ্রাম পর্যন্ত রাস্তা তৈরি করতে বললেন এবং রাস্তা তৈরি হলেই বিয়ের দিন ধার্য করা হবে বলে বাড়িতে ফিরে যান। এক পর্যায়ে ভবানীর পিতা ছাতিয়ান গ্রাম থেকে নাটোর পর্যন্ত একটি কাল্পনিক রাস্তা তৈরি করতে যে ব্যক্তিদের জমির প্রয়োজন হয় তাদের শরণাপন্ন হলে কেউ পয়সার বিনিময়ে কেউ বা বিনা মূল্য জমি দিয়ে দিলে ছাতিয়ান গ্রামের জমিদার তার বাড়ি থেকে নাটোর পর্যন্ত লাল শালুর কাপড় বিছিয়ে রাস্তা তৈরি সম্পন্ন পর ভবানীকে বিয়ে করে নাটোর রাজপ্রাসাদে নিয়ে যায়। আর সেই থেকে ভবানী হলো রাণী ভবানী।

রানী ভবানীর কীর্তিরাজি নিয়ে বেশির ভাগ ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে জনশ্রুতি গুরুত্ব পেয়েছে। অন্যদিকে অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় লিখিত বিভিন্ন সূত্রের পাশাপাশি জনশ্রুতি যাচাই-বাছাই করে যে ইতিহাস লিখতে চেষ্টা করেছেন, সেখানেও উগ্র হিন্দুত্বের ছাপ স্পষ্ট। ফলে সব সূত্র থেকে মৌলিক অবস্থানে দাঁড়িয়ে রানী ভবানীর পরিচয় উদ্ধার বেশ কঠিন কাজ। ‘রানী ভবানী’ শীর্ষক গ্রন্থের একটি অধ্যায়ে অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় সরাসরি ভবানীকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন ‘হিন্দু-রমণী’ পদবন্ধে। এখানে তিনি অধ্যায়ের শুরুটা করেছেন এভাবে— ‘রানী ভবানী বিধবা হিন্দু-রমণী। হিন্দু-রমণী বলিতে অধিকাংশ ইউরোপীয়গণ যেরূপভাবে নাসিকা-কুঞ্চন করিয়া আন্তরিক অবজ্ঞা প্রদর্শন করিতে ইতস্ততঃ করেন না, রানী ভবানীর কীর্তিকলাপ দেখিয়া অনেকেই তাঁর প্রতি সেরূপ অবজ্ঞা প্রদর্শনের অবসরপ্রাপ্ত হন নাই।’ এক্ষেত্রে অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় রানী ভবানী সম্পর্কে যে আলোকপাত করেছেন, সেখানে তাঁর দুটি দৃষ্টি গুরুত্বের সঙ্গে অধ্যয়ন করা জরুরি। তিনি রানী ভবানীকে বিচার করতে চেয়েছেন একই সঙ্গে একজন হিন্দু ও একজন ইতিহাসবিদ হিসেবে। আর রানী ভবানী কার্যত তিনটি সত্তার প্রতিনিধিত্বকারী। এক্ষেত্রে একাধারে একজন হিন্দু, একজন নারী ও বিপ্লবী শাসকের প্রতিমূর্তি তিনি। ঔপনিবেশিক কালপর্বের শুরুতে আফ্রিকা থেকে শুরু করে লাতিন আমেরিকা কিংবা আরো অন্য সব দেশেও এমন চরিত্রের দেখা মেলে। তবে বাংলা তো বটেই, ভারতবর্ষের প্রেক্ষাপটে শক্তিশালী নারী শাসক হিসেবে রানী ভবানীর গুরুত্ব বেড়ে যায় অনেকাংশে। আর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রাক্কালে যখন নিজ নিজ অঞ্চলের ওপর কর্তৃত্ব ধরে রাখাটা বড় দায়, ঠিক তখনই অফুরান সাহস, সত্যনিষ্ঠা, পরহিতাকাঙ্ক্ষা ও স্বদেশপ্রেমের বলে ভবানী হয়ে উঠেছিলেন অনন্য ও অসাধারণ শাসনের প্রতিমূর্তি। নিজ আবাসভূমের স্বাধীনতা ধরে রাখতে প্রজাদের থেকেও নৈতিক সমর্থন পেয়েছিলেন বেশ ভালোভাবেই।

পুরো বাংলার প্রায় অর্ধেকের বেশি অঞ্চলের ওপর দাপটের সঙ্গে কর্তৃত্ব ধরে রেখেছিলেন রানী ভবানী। এক্ষেত্রে বিশাল রাজ্য সঠিকভাবে শাসন করার জন্য অনেকগুলো ইউনিটে ভাগ করেছিলেন তিনি। এক্ষেত্রে একজন হিন্দু ধর্মানুরাগী হিসেবে অনেক মন্দির যেমন তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন, তার পাশাপাশি জনগণের দিনানুদৈনিক প্রয়োজন মেটাতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি তিনি। বিশেষ করে পুরো বাংলায় তখনকার দিনে আর যাই হোক নদী-নালা ও খাল-বিলের অভাব ছিল না। নদীবাহিত বন্যার পাশাপাশি সামান্য বৃষ্টিতেই বিভিন্ন স্থান তলিয়ে যেত। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে পানি জমে পথঘাট চলাচলের উপযোগী থাকত না। ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর বসবাস করার সক্ষমতা হারালে গৃহহীন হতে হয়েছে অনেককে। কিন্তু ভাগ্যদোষে এ অঞ্চলের মানুষই গ্রীষ্মকালে নিদারুণ পানিকষ্ট ভোগ করত। সব মিলিয়ে পানি নিয়ে পুরো জনপদের মানুষের জন্য এক উভয় সংকট উপস্থিত হয়েছিল তখন। অন্যদিকে কৃষিপ্রধান অর্থনীতির এ অঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে পানি বাদে কিংবা বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানির প্রকোপে নানা ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে স্থানীয় অধিবাসীদের। এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে তখনকার জমিদার ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছেন। এক্ষেত্রে রানী ভবানী যে উন্নয়ন কাজগুলো করেছিলেন, তার অনেকগুলোই কালের গ্রাসে হারিয়ে গেছে। অনেক মন্দির ভেঙে পড়েছে, অনেক স্থাপনা বিলীন হয়েছে বন্যার তোড়ে। তবে পানিকষ্ট দূর করতে তিনি যে পুকুর ও দীঘি খনন করিয়েছিলেন, সেগুলোর বেশ কয়েকটি আজো টিকে আছে কালের সাক্ষী হয়ে।

শুষ্ক মৌসুমে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় একবার নাটোররাজের এস্টেট ভ্রমণ করতে গিয়ে নিদারুণ যন্ত্রণার মধ্যে পড়েছিলেন। অনেকখানি পথ চলার পর তিনি একটি বিশাল দীঘি দেখতে পান। পরে স্থানীয় অধিবাসীদের কাছে প্রশ্ন করে তিনি জানতে পারেন, এটা আর কারো নয়, রানী ভবানীর কীর্তি। বর্তমানে বিস্তৃত হাইওয়ে ধরে সহজেই নাটোর পৌঁছা সম্ভব। তবে তখনকার দিনে গ্রীষ্মের ধূলিধূসরতা কিংবা বর্ষার একহাঁটু কাদাভরা পথে দীর্ঘ ভ্রমণ করে তবেই দেখা মিলত নাটোর রাজবাড়ীর। ক্লান্তিকর ভ্রমণে পথে বিশ্রামের কোনো সুযোগ যেমন ছিল না, তেমনি নানা স্থানে ডাকাত দলের আক্রমণের ভয়ে তটস্থ থাকতে হতো সবাইকে। রানী ভবানী পথিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সেখানে অনেক পান্থশালা নির্মাণ করেছিলেন। সেখানে পথিকদের প্রয়োজনীয় স্নান-আহারের সুব্যবস্থা পর্যন্ত করা হয়েছিল তখন। সেখানকার ‘ভবানী জাঙ্গাল’ নামক বিশেষ সেতু ও রাস্তা তৈরি করেছিলেন।

হিন্দুদের তীর্থস্থান কাশীতে তিনি ভবানীশ্বর শিব স্থাপন করেছিলেন। সেখানকার বিখ্যাত দুর্গাবাড়ি, দুর্গাতলা ও কুরুক্ষেত্রতলা নামের যে জলাশয়, তার সঙ্গেও জড়িত রানী ভবানীর নাম। এর পাশাপাশি হাওড়া শহর থেকে কাশী পর্যন্ত ভবানী যে বেনারস রোড তৈরি করেছিলেন, তা এখন গিয়ে মুম্বাই সড়কে উঠেছে। বড়নগরে তিনি যে ১০০টি শিবমন্দির স্থাপন করেছিলেন, তার চার-পাঁচটি এখনো টিকে আছে বলে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষকরা মনে করেন। ইংরেজ আমলে গিয়ে রানী ভবানীর দেয়া অনেক দেবোত্তর ও ব্রহ্মোত্তর সম্পত্তির ওপরও কর ধার্য করা হয়। তবে ঐতিহাসিক নথি হিসেবে সেগুলো তাঁর কীর্তিরাজির কথাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। করারোপ থেকে শুরু করে আরো নানা কারণে বাংলার অনেক জমিদার ও ভূস্বামী যখন ইংরেজদের সঙ্গে গোপন আঁতাতে লিপ্ত, রানী ভবানী ছিলেন ভিন্ন স্রোতের মানুষ। তিনি যেকোনো মূল্যে বাংলার স্বাধীনতা সূর্য টিকিয়ে রাখার পক্ষপাতী ছিলেন।

সিরাজউদ্দৌলার পতনের পরও তিনি বেশ কয়েক বছর নিজ জমিদারি রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তবে রানী ভবানীর এলাকাগুলোয় গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্য উত্পাদন হতে দেখে সেখানে ক্রমেই ইংরেজ আধিপত্য বৃদ্ধি পায়। ইংরেজরা কম মূল্যে জোর করে পণ্য কেনার পাশাপাশি মানহীন পণ্য বিক্রিতে প্রভাব খাটায়। এ সময় হঠাত্ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর দেখা দিলে আরেক সমস্যার সম্মুখীন হন রানী ভবানী। শেষ পর্যন্ত ওয়ারেন হেস্টিংসের সঙ্গে নানা ধরনের বিরোধের একপর্যায়ে বিরক্ত হয়ে রাজ্য ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। ছেলের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে স্বেচ্ছায় গঙ্গাবাসের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। বিশেষ করে পাঁচসনা বন্দোবস্তের সময় ইংরেজরা যে নীতি গ্রহণ করেছিল, তার আওতায় অতিরিক্ত কর দিতে অনুত্সাহের কারণে রাজ্য ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। সব মিলিয়ে এ দেশে ঔপনিবেশিক শাসনের প্রত্যুষে এক স্মরণীয় নাম রানী ভবানী; যিনি বাংলার ইতিহাসালেখ্য, জনশ্রুতি কিংবা নিজ কীর্তিরাজির আলোয় সমুজ্জ্বল-চিরভাস্বর হয়ে আছেন আজো।

রাণীর শেষ জীবনে তখকার নাটোর রাজ্যের অধীন ভূমির পরিমাণ ছিল ১২ হাজার বর্গ মাইলেরও অধিক। মোট ১৩৯ পরগনার ১৭৪১৯৮৭ টাকা নবাব সরকারের রাজস্ব ধার্য ছিল। ১৭৩৪ খ্রিস্টাব্দে রাজা রামাকান্ত ১৮ বৎসর বয়সে স্বয়ং রাজ্যভার গ্রহণ করেন। তার সময়ে ১৬৪ পরগনা নাটোর রাজ্যের অধিকারভুক্ত হয়। ১৭৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে রাজা রামাকান্ত রাণী ভবানী ও তার একমাত্র কন্যা তারাকে রেখে ৩২ বছর বয়সে পরলোক গমন করেন। এরপর নাটোর রাজ্যভার রাণী ভবানীর উপর পড়ে। পরবর্তীতে রাণী ভবানী রঘুনাথ লাহরীর সাথে তারার বিয়ে দেন এবং রাণী ভবানী তার জামাতার হাতে রাজ্যভার অর্পণ করে নবাব সরকার জামাতার নামে জারি করেছিলেন। কিন্তু ১৭৮৮ খ্রিস্টাব্দে সেই প্রিয় জামাতার মৃত্যু হওয়ায় আবার তাকে রাজ্যভার গ্রহণ করতে হয় এবং একমাত্র কন্যা তারা বাল্য বিদবা হয়ে তার সাথে বাস করতেন। দত্তক পিতা রামাকৃঞ্চ রায়ের ঔদাসীন্য হলে তার সম্পত্তি নিলাম হয়ে যায়। রাণী ভবানী বিশাল জমিদারীর মালিক হয়েও সাধারণ বিধবার বেশে থাকতেন। সেই রাণী ভবানীর জন্মস্থান ছাতিয়ান গ্রামের জমিদার বাড়িটি এখন সুধুই কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখনো এই জমিদার বাড়ি দেখার জন্য দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত মানুষ এসে ভিড় জমায়। সরকারি উদ্যোগে জমিদার বাড়িটি সংস্কার করা হলে একদিকে ধ্বংস ও দখলদারদের কবল থেকে রক্ষা হবে। অন্যদিকে বদলাবে এই জমিদার বাড়ির এলাকার পরিবেশ।

SHAHANABD.COM

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

আসুন ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতন কে না বলি

© All rights reserved © 2020  doinikuttoron.com
Customized By Zoya Web Host